যিনার সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্তিসমূহ
যিনার অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হল বিবাহোত্তর যৌনকর্ম (বিবাহিত মুসলিম পুরুষ এবং বিবাহিত মুসলিম নারীর মাঝে সঙ্ঘটিত, যারা একে ওপরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ নয়), এবং বিবাহপূর্ব যৌনকর্ম (অবিবাহিত মুসলিম পুরুষ এবং অবিবাহিত মুসলিম নারীর মাঝে সঙ্ঘটিত)। ইসলামের ইতিহাসে, মুসলিম পুরুষের সাথে কোন দাসীর যৌনকর্মও যিনার অন্তর্ভুক্ত, যদি ওই দাসীটি ওই মুসলিম পুরুষের নিজের সম্পত্তি না হয়ে থাকে।[৫৬][৫৭]
পতিতাবৃত্তি, ধর্ষণ, সমকামিতা, পায়ুমৈথুন (লিওয়াত), পশুকামিতা এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে সঙ্ঘটিত যে কোন প্রকারের অবৈবাহিক যৌনকর্ম যাতে জরায়ুতে শিশ্নের প্রবেশ ঘটে না সেগুলোও যিনার অন্তর্ভুক্ত। শরিয়া যিনাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে একজন অবিবাহিত মুসলিম, একজন বিবাহিত মুসলিম ("মুহসান") এবং একজন দাস/দাসীকে (মা মালাকাত আইমানুকুম) পৃথকভাবে বিচার করে। এক্ষেত্রে বিবাহিত মুসলিমকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে পাঁথর নিক্ষেপ করতে হবে (রজম), যেখানে একজন অবিবাহিত মুসলিমকে বাধ্যগতভাবে ১০০ বেত্রাঘাত পেতে হবে এবং একজন অধিভুক্ত-দাস/দাসীকে ৫০ বেত্রাঘাত পেতে হবে।[৯][৫৮] দৈহিক মর্দন, চুম্বন, প্রেমময় আদর ও আলিঙ্গন, হস্তমৈথুন এবং পরস্পর অবিবাহিত একাধিক ব্যক্তির মাঝে যে কোন প্রকারের যৌন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া যিনার একটি পরোক্ষ প্রকরণ হিসেবে গণ্য হয়।[৫৯][৬০]
ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ আছে যে, স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝে সঙ্ঘটিত ইসলামে নিষিদ্ধ এবং অনুল্লেখিত যৌনকর্মসমূহের সম্পর্কে যিনার প্রকরণের প্রকৃতি এবং শারিয়া-নির্ধারিত শাস্তি কি হবে, যেমন মুখমৈথুন, পারস্পারিক হস্তমৈথুন এবং শরিয়া নিষিদ্ধ করে এমন সময়গুলোতে যৌনকর্ম, যেমনঃ বাধ্যতামূলক ধর্মীয় উপবাস বা ফরজ সাওমের সময়, হজ্বের সময় এবং স্ত্রীর মাসিক চলাকালীন সময়।[৬১]আবু হানিফা এবং মালিক, এবং তাদের নামের প্রধান দুটি ফিকহ, অনিয়মিত যৌনকর্মের নিয়ম নির্ধারণের ক্ষেত্রে "নাজাসাহ নীতি" ব্যবহার করে, যেমনঃ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মুখমৈথুন বর্জনীয় এবং অননুমোদিত (মাকরুহ), কারণ এটি অপবিত্রতা(হাদাছ-আকবর, حدث أکبر)'র দিকে পরিচালিত করে।
অভিযোগ যাচাই প্রক্রিয়া এবং শাস্তি
সুন্নি ফিকহের চার মাজহাবে (ইসলামি আইনশাস্ত্রে), এবং শিয়া ফিকহের দুটি মাজহাবে, যিনা পরিভাষাটি হল শরিয়ায় (ইসলামি আইনে) বৈধ নয় এমন যৌনসঙ্গমের পাপ এবং তা হুদুদ(ইসলামি শাস্তির একটি প্রকার, যা আল্লাহ কর্তৃক বাছাইকৃত কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্ধারিত) অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।[৬২] যিনার ক্রিয়াকলাপ প্রমাণ করার জন্য, শরিয়া আদালতের একজন কাজি (ধর্মীয় বিচারক) যেসব বিষয়ের উপর নির্ভর করেন সেগুলো হল একজন অবিবাহিত মহিলার গর্ভধারণ, আল্লাহর নামে দোষ স্বীকার, অথবা যৌনকর্মের চারজন প্রত্যক্ষদর্শী। শেষ দুই প্রকারের পদ্ধতি সেভাবে প্রচলিত নয়, ইসলামের ইতিহাসে যিনার সবচেয়ে চলমান মামলাসমূহ হল অবিবাহিত গর্ভবতী মহিলা সম্পর্কিত।[৫৬][৬৩] ইসলামি ক প্রদত্ত শিক্ষা ধর্ষণের মকাদ্দমা প্রমাণ করতে কোন পরিষ্কার নিয়ম প্রদান করে নি, এবং এ কারণে ধর্ষণ প্রমাণ করতে চারজন সাক্ষী পেশ করার কোন আবশ্যিক প্রয়োজন নেই;[৬৪][৬৫] তা সত্ত্বেও ইসলামি আইনের কিছু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের নিয়ম আছে যে, যিনার অভিযোগে অভিযুক্ত একজন গর্ভবতী মহিলা যিনি দাবি করেন যে যৌনকর্মটি তার সম্মতিক্রমে ঘটেনি তাকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে সে চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সম্মুখে ধর্ষিত হয়েছে এবং আদালতে সেই চারজনকে হাজির করে তাদের সাক্ষ্য পেশ করতে হবে। এই নিয়মের কারণে এ পর্যন্ত বহু মামলায় ধর্ষণে নির্যাতিত মহিলাদেরকে যিনার শাস্তি দেয়া হয়েছে।[৬৬][৬৭]উপযুক্ত প্রত্যক্ষদর্শী ব্যতীত যিনার অভিযোগ ইসলামে মিথ্যা অপবাদ (কাজফ, القذف) হিসেবে গণ্য হয়, যা হল একটি হুদুদের শাস্তিযোগ্য অপরাধ।[৬৮][৬৯]
সাক্ষ্য-প্রমাণ
ইসলামে কোন পুরুষ বা কোন নারীকে যিনার শাস্তি দেয়ার জন্য বিশ্বস্ত তথ্যপ্রমাণ উপস্থিত করা প্রয়োজন। এগুলো হল:[৮][৫৬][৭০]
- একজন মুসলিম কর্তৃক যিনার দোষ স্বীকার। তবে, উক্ত ব্যক্তি যে কোন সময়ে দোষ স্বীকারকে প্রত্যাহার করার অধিকার পাবে; উক্ত ব্যক্তি যদি দোষ স্বীকার প্রত্যাহার করে, তখন তাকে আর যিনার শাস্তি দেয়া যাবে না। (৪ জন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী ব্যতিরেকে), অথবা
- কোন নারী যদি গর্ভবতী হয় কিন্তু বিবাহিত না হয়, অথবা
- নির্ভরযোগ্য ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, তাদের প্রত্যেকেই একই সময়ে সঙ্গমরত (লিঙ্গ প্রবেশকৃত) সময়ে বা অবস্থায় দেখে থাকতে হবে।
যিনার জন্য চারজন সাক্ষীর আবশ্যকতা, যেটি পুরুষ বা নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগকৃত মামলায় প্রয়োগ করা হয়, সেটিও কুরআনের আয়াত ২৪:১১ থেকে ২৪:১৩ এর মধ্যে এবং বিভিন্ন হাদিস এ উল্লেখ করা হয়েছে।[৭২][৭৩] কিছু ইসলামি পণ্ডিত দাবি করেন যে চার জন পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শীর আবশ্যকতা ছিল সেসব যিনার ক্ষেত্রে যেগুলো প্রকাশ্য স্থানে বা জনসম্মুখে ঘটে থাকে। এনিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে যে, নারী প্রত্যক্ষদর্শী যিনার ক্ষেত্রে সাক্ষী হিসেবে অনুমোদনযোগ্য কিনা। (অন্যান্য অপরাধসমূহের ক্ষেত্রে, শরিয়া দুই জন নারী সাক্ষীকে একজন পুরুষ সাক্ষীর সমতুল্য হিসেবে গণ্য করে। )।[৭৪] ইসলামের সুন্নি ফিকহ মতে, নারী মুসলিম, শিশু এবং অমুসলিম সাক্ষীরা যিনার ক্ষেত্রে অনুমোদনযোগ্য নয়।
যে কোন অসম্পৃক্ত সাক্ষী, পারস্পারিক সম্মতিবিহীন যৌনসংগমের ভুক্তভোগী, যে কোন মুসলিমকে যিনার দায়ে অভিযুক্ত করে, কিন্তু শরিয়া আদালতের সামনে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক, ধার্মিক পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শী (তাযিকিয়াহ-আল-শুহুদ) উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, সে মিথ্যা অভিযোগের অপরাধ (কাজফ, القذف) করে, এবং তাকে জনসম্মুখে আশিটি বেত্রাঘাত প্রদান করতে হবে।[৭৫][৭৬]
যিনার চার সাক্ষী বিশিষ্ট বিচারকার্যের অভিযোগ খুবই বিরল। বর্তমানকালে, অধিকাংশ মামলার বিচারকার্য তখন হয় যখন কোন মহিলা গর্ভবতী হয়, অথবা যখন তাকে ধর্ষণ করা হয় এবং সে শাস্তির দাবি জানায় এবং শরিয়া কর্তৃপক্ষ ধর্ষককে যথাযথভাবে তদন্ত করার পরিবর্তে মহিলাটিকে যিনার শাস্তি প্রদান করে থাকে।[৬৬][৭৭]
কিছু ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্রের পাঠশালা) শুবা(সন্দেহ) নীতি সৃষ্টি করেছিল, যেখানে যিনার জন্য কোন শাস্তি দেয়া হত না যদি কোন মুসলিম পুরুষ দাবি করত যে, সে মনে করেছিল যে সে তাঁর বিবাহিত স্ত্রীর সাথে অথবা তাঁর অধিকৃত দাসীর সাথে মৈথুন করছিল।[৮]
Reviewed by Adam Blog
on
April 21, 2023
Rating:
